ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি;টবে ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি;ড্রাগন ফল দাম

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

ইংরেজি নাম: Dragon Fruit

বৈজ্ঞানিক নাম: Hylocereus undatus

জাত:
ড্রাগন ফল সাধারণত তিন প্রজাতির হয়-
১) লাল ড্রাগন ফল, পিটাইয়া। এর খোসার রঙ লাল এবং শাঁস সাদা। এই প্রজাতির ফলই বেশি দেখা যায় ।
২) কোস্টারিকা ড্রাগন । খোসা ,শাঁস উভয়ের রঙই লাল।
৩) হলুদ রঙের ড্রাগন । এই জাতের ড্রাগন ফলের খোসা হলুদ রঙের এবং শাঁসের রঙ সাদা।
বাংলাদেশে অবমুক্তায়িত জাত
বাউ ড্রাগন ফল-১,
বাউ ড্রাগন ফল-২,
বাউ ড্রাগন ফল-৩ ও
বাউ ড্রাগন ফল-৪ ।

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

আমাদের দেশের আবহাওয়ায় প্রতিনিয়তই বিভিন্ন প্রকার বিদেশি ফল ইন্ট্রোডাকশন করানো হচ্ছে এবং তা সফলভাবে চাষও করছেন আমাদের দেশের ফলচাষীরা । অ্যাভোকেডো, ম্যাঙ্গোস্টিন, স্ট্রবেরি, কিউই, রাম্বুটান, লংগান, ল্যাংসাট, জাবাটিকাবা, শান্তল, আপেল, পিচফল, আলুবোখারা, পার্সিমন, এগ ফ্রুট, সাওয়ার সপ, নাশপাতী, প্যসন ফ্রুট, ডুরিয়ানের মতো ড্রাগন ফলও এদেশের জলবায়ু এবং মাটিতে দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে । ড্রাগন ফল চাষ করে চাষীরা ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন । বাংলাদেশে প্রতি কেজি ড্রাগন ফল বিক্রি হয় ২৫০-৩০০ টাকা কেজি দরে।

ড্রাগন এক প্রকার ক্যাকটাস প্রজাতির ফ্রুট । এই ফল মূলত ড্রাগন ফল হিসেবে সুপরিচিত। গণচীন-এর লোকেরা এটিকে আগুনে ড্রাগন ফল ও ড্রাগন মুক্তার ফল বলে, ভিয়েতনামে মিষ্টি ড্রাগন, ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়াতে ড্রাগন ফল , থাইল্যান্ডে ড্রাগন স্ফটিক নামেও পরিচিত এই ফল । অন্যান্য স্বদেশীয় নাম হলো স্ট্রবেরি নাশপাতি অথবা নানেট্টিকাফল । এই ফলটি একাধিক কালার হয়ে থাকে। তবে লাল রঙের ড্রাগন ফল বেশি । আমাদের দেশে ২০০৭ সালে প্রথম থাইল্যান্ড , ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে এ ফলের বিভিন্ন জাত ইনট্রোডাকশন করা হয় । নরম শাঁস ও মিষ্ট গন্ধযুক্ত গোলাপি বর্ণের এই ফল খেতে অনেক সুস্বাদু। তার সাথে ভিটামিন সি, মিনারেল পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এবং ফাইবারের উৎকৃষ্ট উৎস এই ফল ।

যেভাবে ঘরোয়া পদ্ধতিতে বাড়িতে বা ছাদে পদ্ম ফুল চাষ করবেন

চাষ পদ্ধতি

জমি নির্বাচন ও তৈরিঃ
সুনিষ্কাশিত উঁচু এবং মাঝারি উঁচু উর্বর জমি নির্বাচন করতে হবে ও ২-৩ টি টিলেজ দিয়ে ভালোভাবে মই দিতে হবে।
রোপণ পদ্ধতি ও রোপণ সময়ঃ
সমতল ভূমিতে বর্গাকার অথবা ষঢ়ভূজাকার ও পাহাড়ি ভূমিতে কন্টুর পদ্ধতিতে ড্রাগন ফলের কাটিং রোপণ করতে হবে । ড্রাগন ফল রোপণের জন্য উপযোগী সময় হলো মধ্য এপ্রিল হতে মধ্য অক্টোবর ।

বংশবিস্তারঃ
অঙ্গজ পদ্ধতি ও বীজের মাধ্যমে ড্রাগন ফলের বংশবিস্তার হয়ে থাকলেও মাতৃ গুনাগুণ বজাই রাখার জন্য অঙ্গজ পদ্ধতিতে অর্থাৎ কাটিং এর মাধ্যমে বংশ বিস্তার করাই ভালো। কাটিং এর সফলতার হার প্রায় শতভাগ এবং তাড়াতাড়ি ফল হয় । কাটিং থেকে উৎপাদিত একটি গাছে ফল ধরতে ১২-১৮ মাস লাগে। সাধারণত বয়স্ক ও শক্ত শাখা ১ থেকে ১.৫ ফুট কেটে হালকা ছায়াতে বেলে দোআঁশ মাটিতে গোড়ার দিকের কাটা অংশ পুতে সহজেই চারা করা যায়। তারপর ২০ থেকে ৩০দিন পরে কাটিং এর গোড়া থেকে শেকড় বেরিয়ে আসবে । এখন এটা মাঠে লাগানোর উপযুক্ত হবে । তবে উপযুক্ত পরিবেশে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাটিংকৃত কলম সরাসরি মূল জমিতে লাগানো যেতে পারে ।

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

প্রনিং ও ট্রেনিংঃ
ড্রাগন ফল দ্রুত বাড়ে এবং মোটা ব্রান্চ তৈরি করে। একটি ১ বছরের গাছ ৩০টি পর্যন্ত শাখা তৈরি করতে পারে এবং ৪ বছরের বয়সী একটি ড্রাগন ফলের গাছ ১শ’ ৩০টি পর্যন্ত প্রশাখা তৈরি করতে সক্ষম । তবে শাখা প্রশাখা উৎপাদন উপযুক্ত ট্রেনিং এবং ব্যবস্থাপনার ওপরও নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১২ থেকে ১৮ মাস পর একটি গাছ ফল ধারণ করে থাকে । ফল সংগ্রহের ৪০ থেকে ৫০টি প্রধান শাখায় প্রত্যেকটি ১,২টি সেকেন্ডারি শাখা অনুমোদন করা হয় । এ ক্ষেত্রে টারসিয়ারী ও কোয়ার্টারনারী প্রশাখাকে অনুমোদন করা হয় না। ট্রেনিং এবং প্রুনিং এর কার্যক্রম দিনের মধ্যে ভাগে ভালো হবে । ট্রেনিং এবং প্রুনিং করার পর অবশ্যই যে কোন ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে। নচেৎ বিভিন্ন প্রকার রোগবালাই আক্রমণ করতে পারে।

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি
ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

গর্ত তৈরীও চারা রোপণঃ

১.৫ মিটার x ১.৫ মিটার x ১ মিটার আকারের গর্ত করে সেটি রোদে খোলা রাখতে হবে। গর্ত তৈরির ২০-২৫ দিন পর প্রতি গর্তে ২৫-৩০ কেজি পচা গোবর , ২৫০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমওপি, ১৫০ গ্রাম জিপসাম ও ৫০ গ্রাম জিংক সালফেট সার গর্তের মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করতে হবে। প্রয়োজনে সেচ দেয়া লাগবে । গর্ত ভরাটের ১২-১৫ দিন পর প্রতি গর্তে ৫০ সেমি দূরত্বে ৪ টি করে চারা সোজাভাবে মাঝখানে লাগাতে হবে । চারা রোপণের ১ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত প্রতি গর্তে ৩ মাস পর পর ১০০ গ্রাম করে ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে।
ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি
পরিচর্যাঃ
আগাছা অপসারণ করে নিয়মিত সেচ প্রদান ও প্রয়োজনে চারপাশে বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে। গাছ লতানো এবং ১.৫ থেকে ২.৫ মিটার লম্বা হওয়ায় সাপোর্টের জন্য ৪ টি চারার মাঝে ১টি সিমেন্টের ৪ মিটার লম্বা খুঁটি পুঅঁততে হবে। চারা বড় হলে খড়ের বা নারিকেলের রশি দিয়ে বেঁধে দিতে হবে যাতে কাণ্ড বের হলে খুটিইকে আঁকড়ে ধরে গাছ সহজেই বাড়তে পারে। প্রতিটি খুঁটির মাথাই একটি করে পুরাতন টায়ারকে মোটা তারের সাহায্যে আটকিয়ে দিতে হবে। তারপর গাছের মাথা এবং অন্যন্য ডগা টায়ারের ভিতর দিতে বাইরের দিকে ঝুলিয়ে দিতে হবে। কেননা এভাবে ঝুলন্ত ডগাই ফল বেশি ধরবে ।

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

সার প্রয়োগঃ

গাছের বয়স ১-৩ বছরে মধ্যে মাদা প্রতি গোবর সার ৪০-৫০ কেজি, ইউরিয়া ৩০০ গ্রাম, টিএসপি ২৫০ গ্রাম, এমওপি ২৫০ গ্রাম একসঙ্গে মিশ্রণ করে প্রয়োগ করতে হবে। গাছের বয়স ৩-৬ বছরে মধ্যে মাদা প্রতি গোবর সার ৫০-৬০ কেজি, ইউরিয়া ৩০০ গ্রাম, টিএসপি ৩০০ গ্রাম এবং এমওপি ৩০০ গ্রাম একসঙ্গে মিশ্রণ করে দিতে হবে।
ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

সেচ ব্যবস্থাপনাঃ

ড্রাগন ফল খরা এবং জলাবর্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই শুস্ক মৌশুমে ১০-১৫ দিন পর পর সেচের ব্যবস্হা করতে হবে।এছাড়া ফলন্ত গাছে ৩ বার অর্থাৎ ফুল ফোটা অবস্থায় একবার, ফল মটর দানা অবস্থায় একবার এবং ১৫ দিন পর আরেকবার ইরিগেশন দিতে হবে।

রোগ ও বালাই ব্যবস্থাপনাঃ

ড্ফরাগন ফলে রোগ বালাই খুবই একটা চোখে পড়ে না। তাবে কখনো কখনো এই গাছে মূলপঁচা, কান্ড এবং গোড়া পঁচা রোগ দেখা যায়।
ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

মূলপচাঃ

গোড়ায় অতিরিক্ত পানি জমে গেলে রুট পঁচে যায়। এ রোগ হলে মাটির ভিতরে গাছের মূল একটি দুটি করে পঁচতে পঁচতে গাছের সমস্ত রুট পঁচে যায়। গাছকে উপরের দিকে টান দিলে মূল ছাড়া শুধু কান্ড উঠে আসে। তবে এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে উঁচু জমিতে এই ফলের চাষ করা শ্রেয় । এ রোগটি Fusarium sp. এর মাধ্যমে হয় ।ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

কাণ্ড ও গোড়া পচা রোগঃ

ফানজাই অথবা ব্যাকটেরিয়া দ্বারা এ রোগ হতে পারে। এ রোগ ঙহলে গাছের কাণ্ডে প্রথমে হলুদ রং ও পরে কালো রং ধারণ করে এবং পরবর্তীতে ঐ অংশে পঁচন শুরু হয় এবং পঁচার পরিমাণ ক্রমশই বাড়তে থাকে । এ রোগ দমনের জন্য যে কোন ছত্রাকনাশক (বেভিস্টিন, রিডোমিল, থিওভিট ইত্যাদি) ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করে সহজেই এই রোগ দমন করা যায়।
ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

পোকা মাকড়ঃ

ড্রাগন ফলের জন্য ক্ষতিকর পোকা মাকড় খুব একটা চোখে পড়ে না, তবে মাঝে মাধ্যে এফিড এবং মিলি বাগের আক্রমণ দেখা যায়। এফিডের বাচ্চা ও পূর্ণ বয়স্ক পোকা গাছের কচি শাখা ও পাতার রস চুষে খায়, ফলে আক্রান্ত গাছের কচি শাখা,ডগার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে । এ পোকা ডগার উপর আঠালো রসের মতো মল ত্যাগ করে ফলে শুটিমোল্ড নামক কালো ছত্রাকের সৃষ্টি হয়। এতে গাছের খাদ্য তৈরি ব্যাহত হতে থাকে । এতে ফুল ও ফল ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। এ পোকা দমনে সুমিথিয়ন/ডেসিস/ম্যালাথিয়ন এসব কীটনাশক প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২৫ মিলিলিটার বা ৫ কাপ ভালো ভাবে মিশিয়ে স্প্রে করলে সহজেই এই রোগ দমন করা যাবে ।

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি
ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

ড্রাগন ফল সংগ্রহ ও ফলনঃ

ড্রাগন ফলের কাটিং থেকে চারা রোপনের পর ১ থেকে ১.৫ বছর বয়সের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যেতে পারে । ফল যখন সম্পূর্ণ লাল রঙ ধারণ করে তখন সংগ্রহ করতে হয় । গাছে ফুল ফোঁটার মাত্র ৩৫-৪০ দিনের মধ্যেই ফল খাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায় । বছরে ৫-৬টি পর্যায়ে ফল সংগ্রহ করা যাবে । প্রথমত হচ্ছে জুন-অক্টোবরএবং দ্বিতীয় ডিসেম্বর-জানুয়ারি।
ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

ড্রামে বা টবে ড্রাগন চাষঃ

ছাদ বাগানে ড্রাগন ফল চাষ করে ভালো ইল্ড পেতে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসে চারা রোপণ করা উত্তম। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই ড্রাগন চাষ করা যাবে । তবে জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ বেলে দোআঁশ মাটি ড্রাগন চাষের জন্য সর্বোত্তম । ড্রাগন সাধারণত গাছের কাটিং লাগানো হয়ে থাকে । টবে ড্রাগন ফলের কাটিং লাগানোর জন্য ২০ ইঞ্চি ড্রাম অথবা টব সংগ্রহ করতে হবে। কারণ এ আকারের ড্রামে চারা ভালোভাবে রুট ছড়াতে পারবে আর তাতে ফলনও অনেক ভালো হবে। ড্রামের তলায় ৪-৫ টি ছোট ছোট ছিদ্র করে নিতে হবে এবং ছিদ্রগুলো ইটের; ছোট ছোট টুকরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হবে যাতে টবে বা ড্রামে পানি না জমে ।

মাটি তৈরি:

ড্রাম বা টবের ২ ভাগ বেলেদোআঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ৪০-৫০ গ্রাম টিএসপিসার এবং ৪০-৫০ গ্রাম পটাশসার মিশিয়ে টব বা ড্রাম ভর্তি করতে হবে, যেন উপরে পানি দেওয়ার জন্য একটু (৩-৫ সেমি)জায়গা খালি থাকে। এরপর মাটির সাথে অন্যান্য উপাদানগুলো ভালোভাবে মেশানোর জন্য পানি দিয়ে ১০-১২ দিন রেখে দিতে হবে । এরপর মাটি আলগা করে দিয়ে পুনরায় ৪-৫ দিন রেখে দিতে হবে । টবের মাটি ঝুরঝুরে করার পর ড্রামে ভরতে হবে । টবের মাটি ঝুরঝুরে হয়ে ড্রাগনের কাটিংয়ের চারা টবে ৮-১০ সেমি গভীর করে রোপণ করতে হবে।

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি

নববহ্নি
ড্রাগন ফল দাম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *